বৃহস্পতিবার, ২২ মার্চ, ২০১২

আমার অন্যরকম একদিন

দিনের শেষেঃ
এখন কাঁদছি। সশব্দে। নিজের কানেই কিরকম বেসুরো লাগছে। তারপরও কাঁদছি। আর লিখছি। লিখে রাখছি এই দিনটার কথা। বাঙালির আটপৌরে একটা দিনই প্রায়। স্বপ্ন থাকে। স্বপ্ন প্রায় পুরোটা পূরণ হতে গিয়েও হয় না। দিনশেষে প্রাপ্তির খাতা শূন্য। একবারেই শূন্য?


দিনের শুরুঃ

একেবারেই অন্যরকম। সাতটা বাজার আগেই বিছানা ছেড়েছি। ফেসবুকের পাতা আর খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে রেডি। ফুরুফুরে একটা আমেজ। বসন্তকালের সাথে বেশ যায়। আজ বাংলাদেশ ফাইনাল খেলবে। এশিয়া কাপ ফাইনাল। দারুণ খেলেছিল ওরা ভারত, শ্রীলংকার সাথে। পুরো প্রফেশনাল ক্রিকেট। প্রত্যাশা তাই এবার অন্যরকম।

তারপরেঃ

ইউনিতে নিজের রুমে এসে যখন ঢুকি তখনও খেলা শুরু হতে আরও প্রায় ৪৫ মিনিট বাকি। সময়ের ব্যবধানে আমার এখানে খেলা শুরু ৯টায়। কাল রাতের একটা কাজ বাকি ছিল। সেরে ফেললাম চটজলদি। তার আগে ব্রাউজারে ওপেন করে নিলাম ফেসবুক আর ক্রিকইনফো ট্যাব। জানলাম, বাংলাদেশ টসে জিতেছে।

ইনিংস শুরুঃ

একেবারে প্রথম থেকেই দেখেছি। প্রথম বলটা হাফিজ ছেড়ে দিল। সকাল সকাল সিগারেটের তৃষ্ণা পাওয়ায় নিচে গেলাম। রুমে এসে ঢুকতেই দেখি কাভারে রিয়াদ এর ক্যাচ। ১ম উইকেটের পতন। মিউটেড 'ইয়েস' বলেই চেয়ারে বসে পড়লাম আবার। এক মনিটরে খেলা আর অন্য মনিটরে কোড খুলে রাখলাম ক্যামোফ্লেজ হিসেবে।

এরওপরেঃ

মোর্শেদ এসেছিল খানিক পরে। ওর সাথে গল্প আর খেলা দেখতে দেখতেই আরও ২ উইকেট হাপিশ। আমিও খানিক নির্ভার হয়ে ভাবলাম যাই বসের সাথে নিজে থেকেই দেখা দিয়ে আসি। যাতে পরে বিরক্ত না করে।

আধাঘন্টা খানিক পরেঃ

খেলা চলল বাংলাদেশের মত। আর আমার কাজ অনাদরে-অবহেলায় পড়ে রইল ডেস্কটপের এক কোণে। এর ফাঁকে ফাঁকে চলল ফেসবুকিং। যেই বলি 'উইকেট দরকার', আর ওমনি উইকেট। আর কে নেবে? আমাদের সুপারম্যান-আল-হাসান। মাঝে থেকে আফ্রিদি একটু এলোমেলো করে দিল বোলিং। ব্যাপার না। সেও বিদায় নিল ১৮০ এর আগেই।

২০০ তে বুকড?

৬ উইকেট পড়ার পরে ৭, ৮ ও পড়ে গেল টপাটপ। আমি যা বুঝি, ২২০ এর নিচে যে কোন স্কোর বাংলাদেশ অনায়াস দক্ষতায় তাড়া করতে পারবে। আশায় বাঁধিলাম বুক, পাকি হইবে আন্ডার ২০০ বুকড।

হলো নাঃ

৯ উইকেট বাংলাদেশ ফেলেছিল মনে হয় ৪৫/৪৬ ওভারের দিকে। রান তখন ২০৬ এর মত। আমি তখন আরাম করে একটা সিগারেট খাবো ঠিক করছি অল-আউট হলেই। হলো না। পাকি অল-আউট হলো না। শেষ ওভারের খেলা দেখার সময় কল্লোল, মোর্শেদ ও রুমে ছিল। ওদের বলছিলাম রান আর কত হবে? ২২৫? নাহ, রান আরো বেশি হল। ৪৯ ওভার বাংলাদেশের মনমতন খেলা হল। আর শেষ ওভারটা পাকিদের ইচ্ছামতন। আরে, ধূর, এইগুলো ব্যাপার হইল? মজা করে তখন বলেছিলাম, ১০ ওভার কেটে রান ২৫ কমায় দিক। টাইগাররা আরো স্বচ্ছন্দে জিতুক।

বিরতিঃ

বেরিয়ে পড়লাম বাসার উদ্দেশ্যে। ক্যাম্পাসেই থাকি। সাইকেলে ৫ মিনিট। বাংলাদেশের ইনিংসে টেনশন বেশি থাকে। তাই বিড়ি টানতে হয় যেটা বাসায় রুমে বসেই করা যায়। এবং, অতঃপর বেরিয়ে পড়া। বেরিয়েই বুঝলাম, প্রেমে পড় আর নাই বা পড়, এখন বসন্ত। তাপমাত্রা ১৮ এর মতন। হালকা বাতাস। রোদে ঝিকিমিকি সোনালি চুল আর কোমল  ... আচ্ছা, তাড়াহুড়া আছে। বাসায় যাই আগে।

বাংলাদেশঃ

নাজিম একেবারেই ইজি না। আরেক পাশে তামিম কিন্তু দারুণ। গুলের বলে ঐ আপিশ স্ল্যাশটা আরো দারুণ। ইনিংসের প্রথম চার। নাজিম রান না পেলেও উইকেট কামড়ে ছিল। কিন্তু ১০ ওভার পার হওয়ার পরও ... নাহ, হচ্ছে না। আমারও উশখুশ লাগছে।

১৫-৩০ ওভারঃ

গুরুত্বপূর্ণ সময় ইনিংসের। পাকিরা এই টাইমে রানও চেক দিছে আর উইকেটও নিছে। রান মনে হয় এই ১৫ ওভারে হয়েছে ৩৫ এর মত। ৩০ ওভার শেষে ১০০ এর মত। তবে আশার কথা ৭ উইকেট অক্ষত এখনও, সাকিব অক্ষত এখনও।

আমার গল্পঃ

এর পরের কথা আর বলব না। আমি আমার গল্প করি। আমি বিছানায় শুয়ে আরাম করে খেলা দেখতে পারি না। আজকে চেষ্টা করেছিলাম। কাজ হয়নি। ৩২ ওভারের দিকে দেখি আমার সারা শরীর কাঁপছে। নিজের উপরই বিরক্ত হলাম এই হার্ট দেখে। আমি নিজেকে মনে করতাম আমার হৃদয় অনেক বড়। জড়সড় হয়ে এসে বসলাম চেয়ারে। ৯০ বল, ১০৫ রান, সাকিবসহ ৭ উইকেট। হাতের কাছে কোক নিয়ে বসলাম। কেক দিয়ে উদযাপনটার ছকও কেঁটে রাখলাম।

নাসির গেল ১৭০ এ। ব্যাপার না। মুশফিক আছে তো। সাকিব গেল। একটু মিইয়ে গেলাম। মুশিও গেল ১৯০ এ। ফুলস্ক্রীন ছোট করলাম। হতাশ হয়ে সিগারেট ধরালাম। পাঠক জেনে নিবেন এটা অজুহাত মাত্র। মাশরাফি দারুণ খেললো। ফের স্ট্যাটাস 'পাগলা' কে নিয়ে। এভাবেই ১৫ বলে ১৯। ম্যাশ আউট। পরের দুই বল ডট। আমার ছাইদানী প্রায় পূর্ণ। কিন্তু এখন উঠতে পারবো না। ১২ বলে ১৯।

ঐ ১৯ নিয়েছিল পাকিরা শেষ ওভারে। ওটা হয় ক্রিকেটে, আগে ব্যাটিং করলে আরও বেশি হয়। কিন্তু টাইগাররা তো চেজ করছে। প্রেসার আছে। কোন চার-ছয় ছাড়া ৬ বলে ৯ রান। শেষ ওভার করার আগে আমি ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখলাম এইভাবে ... "আমার যেন তোদের মতন ১১ টা ছেলেপুলে থাকে ... "।

এই স্ট্যাটাস টা আমি আর দিতে পারিনি।

কোন স্বপ্ন পূরণের এত কাছে থেকে রিক্ত হাতে ফিরে আসলে কেমন লাগে আমি বলতে পারবো না। সাকিব পারবে। ওকে জিজ্ঞাসা করতে আমার সাহস হয় না। আমি শুধু জানি, আমার আজকের দিনটা একেবারেই অন্যরকম। আজ আমি কেঁদেছি, অনেকদিন পর।

এই কান্নায় অসহায়ত্ব ছিল।

দিনের শেষ ভাগে এসে মনে হচ্ছে, আমি অসহায় নই, আমরা অসহায় নই। আমাদের সাথে ঐ ১১ টা ছেলে আছে যারা প্রায় সবাই আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট কিন্তু তাদের শক্তি, ক্ষমতা অসীম। ওরাই আমাকে আজ বিশ্বের কাছে পরিচিত করে তুলছে।

আবারও অন্যরকম একদিনের অপেক্ষায় রইলাম। কাঁদবো আবারও তবে বিজয়ের কান্না।

শুভ রাত্রি।

শনিবার, ২৫ জুন, ২০১১

চলিতে চলিতে থেমে যায় - ৩

সুখী হওয়ার জন্য কী লাগে? কালো টাকা, সাদা টাকা? গাড়ী-বাড়ী-নারী?

খুব বেশি দিন হয়নি শেষবার যাওয়ার। আবার যাচ্ছি। এই ক'দিন আকন্ঠ কাজে ডুবেছিলাম। টের পাইনি। দেশে যাওয়ার দিন এখন এত্ত কাছে। এই যে যাবো দেশে, এই চিন্তা করেই আমি এখন মস্ত সুখী। গলা ছেড়ে গান গাইছি। রাতের বেলা সাইকেল নিয়ে পাড়া মহল্লায় ঘুরছি আর চিৎকার করছি। সুখী হওয়ার জন্য আসলে তেমন কিছুই লাগে না, শুধু নিজের ইচ্ছেটা থাকলেই হয়।

প্রতিদিন খবর নেই। দেশে গরম কতটা। কলিগরা জানতে চায় ওয়েদার কী রকম। বলি, হট অ্যাণ্ড হিউমিড। কই, তারপরওতো এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এই হট অ্যাণ্ড হিউমিডের মধ্যে যখন দাঁড়াবো তখন তো ঠিকই মনটা জুড়িয়ে যাবে।

দেশে যেয়ে প্রথম কথা হয় কার সাথে বলবো? সিএনজি চালক মামার সাথে। আমি কখনও মামাদের সাথে বেশি কথা বলি না। শুধু এই একটা সময় বাদে। অনেক কথা বলি এবং সিগারেট অফার করি। তারপর সিএনজি যেয়ে প্রথমে থামে একটা মানি এক্সচেঞ্জের কাছে। পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে পরের গন্তব্য ... পুরো ঢাকা।

তার কিছুক্ষণ পরে হয়ত পরিপাটি আমি বের হয়ে যাবো ঢাকার রাস্তায় রাস্তায়। আর সন্ধ্যারও পরে যখন ফিরবো তখন চুল হয়ত ভিজে হয়ে থাকবে ঘাম আর জেল একত্রে মিশে। টি-শার্টটা আর একবারও পরা যাবে না, না ধুয়ে। ক্লান্ত থাকবো আমি। তারপরও সুখী আমি।

অনেক প্ল্যান থাকে। কোন হোটেলে খাবো, কই কই যাবো, ইত্যাদি ইত্যাদি। সবকিছু কোনবারই করা হয়ে ওঠে না। এই যে, এবার যেয়ে করবো বলে ...

আর মাত্র কিছু দিন, কিছু ঘন্টা। তারপর বাংলাদেশে।

বৃহস্পতিবার, ৯ জুন, ২০১১

৭৩০ তম দিনে

০৯-০৬-২০০৯। নয়-ছয়ের খপ্পড়ে পড়েই কি না জানি না, এই দিনটাতেই এখানে এসে পৌঁছেছিলাম। এনস্কেডে, নেদারল্যান্ডসে। বেশ সকালেই স্কিফলে নেমে ট্রেনের টিকেটটা করে এয়ারপোর্টের বাইরে যেয়েই প্রায় তের ঘন্টা বাদে একটা সিগারেট ধরিয়ে আশেপাশের মানুষ দেখছিলাম। তার খানিক বাদেই পে-ফোন বুথ থেকে বাবাকে ফোন করেছিলাম। তারও বাদে ট্রেনে করে যাত্রার শেষটুকু - এনস্কেডের উদ্দেশ্যে।

ইউনি ক্যাম্পাসে আমার প্রথম বাসাটা ছিল নীচতলায়। আশেপাশে ঝোঁপঝাড়। গ্রীষ্মে একেবারে সবুজ হয়ে থাকত চারপাশ। একটু দূরেই ক্ষীণকায়া জলাশয়। বাসাটার মাঝে বেশ স্বপ্নালু একটা ভাব ছিল। আমার ঐ সময়টায় কিছুটা স্বপ্নের দরকারও ছিল - একেবারেই তখন স্বপ্নহীন ছিলাম বলেই হয়তবা।

বাসাটার সোজাসুজি একটা লম্বা রাস্তা ছিল। রাস্তার চারধারে ছিল অনেক অনেক গাছ। ছায়া দিয়ে রাখত ওরা সবসময়। আমি ঐ রাস্তাটার নাম দিয়েছিলাম 'স্বপ্ন রাস্তা'। আর গাছগুলি ছিল আমার বন্ধুদের মত। বন্ধুরা ছায়া দিয়ে আমাকে আমার স্বপ্নের চৌরাস্তায় পৌঁছে দিয়ে যাবে।

তিন মাসের মাথায় ঐ বাসা ছেড়ে দিয়ে এসেছিলাম আমার এখনকার বাসায়। এই বাসাটা আকাশের কাছাকাছি। পাঁচ তলায়। এখান থেকে আর মাটির ঘ্রাণ পাই না, আকাশের শূন্যতা অনুভব করি। নিজের ভেতরকার শূন্যতাও কী? নিজেকে প্রশ্ন করি না ভয়ে। যদি স্মৃতিগুলোর উপর জমে থাকা ধূলো সরাতে গিয়ে নিজেকেই স্মৃতির অতলে হারিয়ে ফেলি?

এইতো বেশ ভালো আছি। বর্তমানকে আঁকড়ে ধরে। কোন একটা শিশিরভেজা সুন্দর সকালের অপেক্ষায়। কখনও যে আসবেই তা সেই নিশ্চয়তা কী আছে? নাই বা থাকলো। স্বপ্নহীন হয়ে বেঁচে থাকা অনেক বড় কষ্টের।

কত্তগুলো দিন চলে গেল এই প্রবাসে! একা একা। প্রিয়জনদের সান্নিধ্য থেকে অনেক দূরে। মাঝে মাঝে চিন্তা করি; যা হতে চেয়েছিলাম তা কী হতে পেরেছি? অথবা আমি কী আসলেই জানতাম আমি কি হতে চাই? কিংবা হয়ত আমার একা থাকতেই ভালো লাগে। কী জানি!

আর লিখব না। এখন সাইকেল নিয়ে ক্যাম্পাসের চারপাশে ঘুরে বেড়াবো। আমার অনেক প্রিয় একটা কাজ। রাতের নীরবতা আমার নীরবতাকে ম্লান করে দেয়। আমি খুশি হই। আমার থেকেও নিঃসঙ্গ কাউকে অনুভব করতে পেরে।

----------------------
এনস্কেডে থেকে
০৯-০৬-২০১১

বুধবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১০

আন্দালুসিয়া থেকে - ২

টেরই পেলাম না কিভাবে ৩টা দিন চলে গেল। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, গত তিন দিনের কথা মনে করলেই কোন মূহুর্তটা চোখের সামনে ভাসে তবে আমি বলবো পাহাড়ের ঢাল ধরে কুঁজো হয়ে উপরে উঠছি যেন কোন পরমা সুন্দরী আমার জন্য চূড়ায় বসে অপেক্ষা করছে। সুন্দরী অনেকেই ছিল উপরে তবে তাদের কেউই আমার জন্য ছিল না। আমার জন্য ছিল পুরোনো, শ্যাওলা ধরা দেয়াল আর দেয়ালের ভিতরে আগের দিনের রাজা-বাদশাহদের বাগানবাড়ি আর দূর্গ। আমার কাছে দুধ থেকে ঘোল উত্তম।

২৭ ডিসেম্বরঃ
---------------------------------------------------
এখানে ভোরবেলায় কাক ডাকে কিনা জানি না, তবে আমাকে উঠতেই হল অনেক সকালে। সূর্য তখন উঠি উঠি করছে। ব্যাগপ্যাক কাঁধে আর গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ঠিক বাস স্টপটাতে গিয়েই দাঁড়ালাম। গন্তব্য ট্রেন স্টেশন। করডোবা যাচ্ছি ট্রেনে।

মালাগা থেকে ১৫০ কিমি দূরত্ব ট্রেনে পাড়ি দিতে সময় লাগে ১ ঘন্টা ১০ মিনিট। ডাচ ট্রেনগুলোর এদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আর এই ট্রেনে চড়ে আপনারও কিন্তু ঘুমিয়ে থাকলে চলবে না। চেষ্টা করুন বসতে জানালার পাশে আর চোখ খোলা রাখুন। প্রকৃতি আপনার চোখ জুড়িয়ে দেবে। কিছু'খন পরপরই পাহাড় আর উপত্যকা ধরা দেবে জানালার পাশে। ডিসেম্বরের শেষভাগে এসেও চারদিকে অনেক সবুজ। এবার নিন, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান আর বলুন দুধ অপেক্ষা ঘোল উত্তম।

 
বেশ বাতাস বইছিল যখন নামি করডোবাতে। ট্রেন স্টেশনের ভিতরেই ট্যুরিসমের কাউন্টার। জেনে নিলাম বাস নম্বর যাওয়ার, করডোবার বিখ্যাত ক্যাথেড্রাল-মস্কে। মুসলিম শাসনাধীন সময়ে এর মূল নির্মাণ আর পরে খ্রিষ্টানরা কর্তৃত্ব নিয়ে সূচনা করে ক্যাথেড্রালের। সামনের চত্বর ঘিরে রয়েছে কমলা বাগান। চটপট কয়েকটা ছবি তুলে টিকিট কেটে ভিতরে এসে ঢুকলাম। সারি সারি, ক্যাথেড্রালের ছাদ ছোঁয়া কারুকর্যময় পিলার আর ততোধিক সুন্দর ক্যাথেড্রালের নকশা-খচিত ছাদ। অনেক প্যাভিলিয়ন আছে ভেতরে। ইতিহাসবিদ নই তাছাড়াও অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি বিশেষ পছন্দ নয় বিধায় আমি শুধু ছবিই তুলে গেলাম। প্রার্থনার মূল বেদীর সামনে যেয়ে চোখ ছানাবড়া। Freaking Gorgeous. একথাটাই বলে ছিলাম তখন। এরপরে আরো অনেকবারই বলেছি মনে হয়।



পুরো বর্ণনা দিয়ে ঘোলটাকে দুধ বানিয়ে দিতে চাই না। শুধু বলব, একবার ঘুরে আসুন।

ক্যাথেড্রাল থেকে বেরিয়ে গেলাম রোমানদের বানানো এক সেতু দেখতে। সেতুর মাথায় এক বিশাল টাওয়ার যেমনটা দেখতে পাওয়া যায় Age of Empires গেমে। নাম ভুলে গেছি এই প্রাচীন স্থাপত্যের। ধরে নেন টাওয়ার অফ হ্যানয়।


এই ফাঁকেই আবার বেকুব টাইপ একটা কাজ করলাম। বুড়িমতন এক মহিলা আমার দিকে ফুল বাড়িয়ে ধরল। আমি ভাবলাম, তরুণী না হোক অসুবিধা কী; আর তাছাড়া ফুল না নিলে মনে কষ্ট পাবেন। এই ভেবে যেই হাত বাড়ালাম উনি খপ করে আমার হাত ধরে ভাগ্য গণনা শুরু করে দিলেন। প্রথমেই বললেন আমি খুব বুদ্ধিমান; আমি মনে মনে বলি, "হ। খুউব বুদ্ধিমান। তাইতো এখন আমার হাত তোমার কাছে"। শুধু ভালো ভালো কথাই শুনলাম। খারাপ কিছু বলল না। পাঁচটি ইউরো খসে গেল।

করডোবার রাস্তাগুলো আমাদের পুরোনো ঢাকার রাস্তার থেকেও সরু। ঐ গলিগুলোতে আবার গাড়িও যায়। এরকম চিপা চাপায় ঘুরতে থাকলাম। খিদে মেটালাম পায়েইয়া (বাঙালী উচ্চারণঃ পায়েলা) খেয়ে। তারপর ঠিক করলাম শহরের অন্য প্রান্তে যাবো। ওলা বলে লোক থামানো শুরু করলাম। সবার এক কথা "তরেতো", মানে সোজা রাস্তায় যাও। যেতে যেতে ভাবতে থাকলাম পা দুটো খুলে হাতে নিয়ে হাঁটতে পারলে ভালো লাগতো।

অবশেষে পৌঁছলাম। এদিকে শুধুই পুরোনো চার্চ। খানিক সময় ছবি তুলে উঠে পড়লাম। এবারের গন্তব্য ট্রেন স্টেশন। ফিরতি ট্রেন ধরতে হবে। বাঁধালাম দ্বিতীয় বিপত্তি। অনেকক্ষণ ধরে ম্যাপ স্টাডি করার ফলাফল হল যেখানে দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম সেখানেই ফেরত আসলাম। ভাগ্যিস হাতে অনেক সময় ছিল। এইবার হাঁটা বাদ আর হাঁটার মত কোন শক্তিও অবশিষ্ট ছিল না। বাসে চড়ে বসলাম।

স্টেশনে এসে দেখি যেই ট্রেনের টিকিট ছিল সেই ট্রেন আসতে এক ঘন্টা দেরি হবে। গেলাম কাউন্টারে, ২০ মিনিট পরের ট্রেনে টিকিট পরিবর্তন করে নিতে কারণ ওটা ঠিক সময়েই আসবে। কাউন্টার থেকে বলা হল চেঞ্জ করার জন্য যেই ট্রেনে করে এসেছি সেটার টিকিট লাগবে। ব্যাগের আর নিজের দেহের চিপায়-চাপায় খুঁজেও যখন পেলাম না তখন নিজেকে গালি দেওয়ার শক্তিটুকুও নেই।

প্রায় ১০ মিনিট পরে হঠাৎ করেই 'ইউরেকা, ইউরেকা' বলে লাফিয়ে উঠলাম। টিকিট রাখা ছিল জ্যাকেটের গোপন পকেটে যেটার কথা আমিই ভুলে বসে ছিলাম। টিকিট চেঞ্জ করে ঠিক সময়মতন উঠে বসলাম মালাগার ফিরতি ট্রেনে।

এখানেই শেষ নয়। ফেরার পর মালাগার শপিং মলগুলো খানিক ঘুরে যখন ঠিক করলাম এইবার বাড়ির পথ ধরি আর বাস স্টপ খুঁজে পাই না। যেগুলো পাই সেগুলো থেকে ঐদিকে কোন বাস যায় না। আমার কোন দোষ নাই। এর কারণ স্পেনের অনেক রাস্তাতেই একদিকে চলাচল। যার ফলে বাস যেদিক থেকে আসে, সেদিক থেকে নাও যেতে পারে। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে পেলাম। আর সেই বাস ঘন্টায় একটা।

আপনাদের আর বসিয়ে রাখবো না আমার সাথে। আমিও এত্তকিছুর পরে অনেক ক্লান্ত। সাথে আনা নাপা খুব কাজে দিচ্ছে। মালাগার গল্পই তো শোনানো হল না। হবে আরেকদিন। আজ যাই।

--------------------
গ্রানাডা থেকে


রাত ১০টা ৩০
২৯ ডিসেম্বর

সোমবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০১০

আন্দালুসিয়া থেকে - ১

কিছুটা ঝোঁকের মাথায় এক রাতের মাঝেই সবকিছু ঠিক করে ফেললাম। কিছুটা অভিমান থেকে কী কারো প্রতি? হয়তো বা হয়তো নয়। সে যাই হোক, এখন শুনেন সেই গল্প। এই যে, তোমাকেও বলছি; শোন।

বড়দিনের ছুটিতে স্পেনের দক্ষিণভাগে যাবো। ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষা মালাগা থেকেই শুরু করবো আন্দালুসিয়া ভ্রমণ। আন্দালুসিয়া স্পেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। অষ্টম থেকে পঞ্চদশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চলের অনেকখানিই ছিল মুসলিমদের শাসনাধীন।

২৬ তারিখে যাত্রা শুরু, আইন্দহোফেন থেকে। আমি চলে এসেছিলাম এক দিন আগেই। তানবীরা আপুর একমাত্র কন্যা ও সন্তান আমাদের মেঘলা মা'র জন্মদিন পালন করতে। রাতটা আপুর বাসাতেই কাটিয়ে, সকালের ভরপেট নাস্তা আর দুপুরে বিরিয়ানী খেয়ে যখন বের হলাম তখন একটা চকচকে দুপুর চারদিকে সোনা রোদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। সত্যি বলতে এই দেশে, এই সময় এরকম ঝলমলে দিন সোনার মতই দামী।

আমি প্রায়ই হালকা বেকুব টাইপ কাজ করি। এবারও তার ব্যত্যয় হলো না। রাস্তার যে পাশ থেকে বাসে ঊঠতে হবে সে পাশে না যেয়ে বিপরীত পাশে চলে গেলাম। অবশ্য খুব সহসাই ভুল বুঝতে পেরে আবার বাক্স-পেটরা নিয়ে ওপারে। এরপরে এয়ারপোর্টে এসে বাকি সব কাজ সহজেই হলো। ভয় ছিল ক্ষীণ মনে আবহাওয়ার কারণে। কিন্তু এমন চমৎকার একটা দিনের কারণে আকাশে উড়লাম ঠিক সময়েই ট্রান্সাভিয়ায় চড়ে।

কিছুটা ঘুম আর বাকিটা সময় টয় স্টোরি ৩ দেখতে দেখতেই পার হয়ে গেলো। পৌঁছে গেলাম মালাগায় নির্ধারিত সময়ের প্রায় ২০ মিনিট আগেই।

এয়ারপোর্টের বিপরীতেই ট্রেন স্টেশন। আমি যেই হোস্টেলে উঠেছি সেখানে ট্রেন-বাসে করেও যাওয়া যায়। আবার এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি বাসও আছে। প্রথমে ট্রেন আর বাসে করে গেলে অবশ্য হোস্টেলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যায়। তাই ট্রেনের টিকিট কেটে অপেক্ষা করতে লাগলাম এবং ট্রেন আসার ঠিক এক মিনিট আগে শুনতে পেলাম লাউড স্পীকারে অবশ্যই স্পেনিশ ভাষায় এক ঘোষণা। এই ক্রিয়ার বিপরীত প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলাম লোকজন সবাই ট্রেন স্টেশন ছেড়ে বাসের দিকে হাঁটা দিল। একজনকে 'ওলা' বলে থামিয়ে ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করে জেনে নিলাম সাময়িক কিছু সময়ের জন্য ট্রেন যাবে না ওদিকে। সুতরাং, বাসই ভরসা এখন।

বাস যেখানে নামিয়ে দিল জায়গাটার নাম 'পাসেও দেল পার্কে'। কিভাবে হোস্টেলে পৌঁছতে হবে এখান থেকে সেই নির্দেশনা আছে কিন্তু কোন ম্যাপ নেই। একজন চমৎকার ভদ্রমহিলাকে থামিয়ে প্রথমে কোন দিকে যেতে হবে জেনে নিলাম। আর তাকে দিলাম পুরোটুকু 'গ্রাসিয়াস'।

এরপরে চলতে চলতেই একসময় পেয়ে গেলাম 'পিকাসা'স কর্ণার'। এখানেই কাটবে আমার আগামী তিনটা রাত। রিসেপশনে বসা 'দিমি' রুম বুঝিয়ে দিল আর তার পাওনা টাকাও বুঝে নিল। একজনের ছোট্ট, ছিমছাম রুম। তবে শব্দ অনেক কারণ একেবারেই সদর দরজার গা ঘেঁষে বলে।

একটু হাত-মুখে পানি দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম চারপাশটা দেখতে। দারুণ আবহাওয়া। তাপমাত্রা ১২-১৫ এর মধ্যেই হবে মনে হয়। হালকা ঝিরিঝিরি বাতাস আর তার সাথে ঝিলমিল করতে থাকা বালিকারা ভ্রমণের ক্লান্তিকে দূর করে দিল প্রায়। প্রায় লিখলাম একটা কারণে। সভ্য সমাজে প্রকাশ্যে বলা যাবে না। প্রাইভেটে আসেন, বলব; তবে এখানেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে।

হোস্টেল থেকে একেবারে কাছেই একটা ঢাল ধরে হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়ল উঁচু উঁচু দেয়াল। বুঝে গেলাম এই হল 'আল-কাজাবা'। একাদশ শতাব্দীতে মুসলিম শাসকদের নির্মিত এক দুর্গ। ভিতরের ছবি ইন্টারনেটে দেখেছি। রাত হয়ে যাওয়ায় এখন আর ঢুকতে পারলাম না। দিনের বেলা কোন একদিন আসতে হবে।



আল কাজাবার পাশ দিয়ে পাহাড়ের ঢালে উঁচু-নিচু হয়ে চলে গেছে দেয়ালসহ এক লম্বা রাস্তা। আল-কাজাবাকে শত্রুদের হাত থেকে সুরক্ষিত করতেই তৎকালীন গ্রানাডার শাসক ইউসুফ বানিয়েছিলেন এই পথ যার নাম 'জিব্রালফারো'। মাঝেমাঝে থেমে বন্দী করে নিলাম পাহাড়ের উপর থেকে দেখা শহরটাকে। শুনেছি এই পথের কোন এক প্রান্তেই আছে এক বাতিঘর। আজ অতদূর যাইনি; যেতে হবে পরে একদিন।



ঘুরতে ফিরতেই দেখছিলাম অনেকগুলো দলকে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে অথবা হয়তো শুধু দু'জন আলাদা হয়ে যেয়ে আলো-আঁধারীতে বসে আছে। ছায়া পড়েনি ওদের আলাদা করে মাটিতে। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে হেঁটে যাই আর ওরা আরও ঘন হয়ে আসে একজন অন্যজনের দিকে। পৃথিবী এক নিষ্ঠুর জায়গা।

কাল সকালে যাবো করডোবা। মালাগা থেকে দেড় ঘন্টার ট্রেন যাত্রা। ওখানেও শুনেছি আছে রোমান আর মুসলিমদের অনেক স্থাপত্য নিদর্শন। সাথে থাকুন, ঘুরে আসি চলুন কাল করডোবা থেকে।


.................................
মালাগা থেকে
রাত ১টা ২০
২৭ ডিসেম্বর, ২০১০

শনিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১০

চলিতে চলিতে থেমে যায় - ২

১।
যে জন্য ব্লগ লেখা - স্মৃতি ধরে রাখা, নিজের অনুভূতিগুলোকে একেবারেই রঙচঙহীন অবস্থায় তুলে রাখা আর অনেকদিন পরে কোন এক অলসবেলায় সেই লেখাগুলোর সাথেই নিজের কথা বলা; আজ ঠিক তাই করলাম।

২।
প্রায় চারমাস কেটে গেছে শেষ লিখেছিলাম। আর শেষ লেখাটা পড়ে দেখলাম ওটাও প্রায় দু'মাস বিরতি দিয়ে লেখা। বোঝা যাচ্ছে বেশ; ছাইপাশ, এলেবেলে, এলোমেলো যা লিখতাম তাও আমাকে ছেড়ে গেছে। গাণিতিক ক্রমের নিয়ম মেনে হয়ত পরের লেখাটা হবে ছয় মাস পরে। দেখা যাক ... :)

৩।
সিঙ্গাপুরে ঘুরে এলাম মাঝ দিয়ে। কনফারেন্সের পেপার সেশন বাং মেরে শহর ঘুরে বেড়ানোর মজা ঠিক ক্লাস বাং মারার মতনই। দারুণ ছিমছাম একটা শহর। ছোট্ট একটা জেলে পল্লী এখন কত উন্নত। কেন? ওরা পারলে আমরা কেন পারি না? মালয়ী, চীনা তামিল আরো নানা বর্ণের মানুষ ওখানে। ওরা যদি এতটা একতাবদ্ধ হতে পারে তবে আমরা প্রায় সবটুকুই বাঙালিরা পারি না কেন? আমার ধারণা, আমাদের রক্তের ভিতরেই একগুঁয়েমির বীজ বোনা। আমরা বোকা এবং শয়তান। আমরা ধৈর্যহীন। আমরা ব্লগে ব্লগে এসব লিখে বেড়াই কিন্তু বিনা মিটারের সিএনজি বর্জন করতে পারি না। আপনি, আমি অবশ্য বর্জন করেও কোন লাভ নেই। আমাদের মধ্যেই কোন একজন সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। মাঝেমাঝে মনে হয়, গণতান্ত্রিক সরকার থেকে অগণতান্ত্রিক, কিছুটা দেশপ্রেমিক একনায়কতন্ত্র অনেক ভালো। সিঙ্গাপুরকেই দেখুন না!

৪।
বাংলাদেশ ঘুরে এসেছিলাম সিঙ্গাপুর থেকে। একেবারেই নীরবে। দ্রব্যমূল্যের দাম বেড়েই চলেছে। এই যেমন বেনসন একটা ৬ টাকা। ৭০/৮০ টাকার সিএনজি ভাড়া ১০০-১২০ টাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। হিসাব করে দেখলাম এক মাস বাংলাদেশে থাকলেই মনে হয় ইঊরোপের চেয়ে খরচ বেশি হয়।

৫।
টরোন্টো ঘুরে আসার সুযোগ পেলাম বাংলাদেশ থেকে আসার পর পরই। দেড় বছর ধরে জ্ঞানার্জনের প্রাপ্তি এই ঘোরাঘুরি। আমি মুগ্ধ। প্রথম মুগ্ধতা পথে ঘাটের লোকের কথা আমি বুঝতে পারি। ডাচ যেহেতু জানি না, এখানে চলাফেরা করলে লোকজনের কথা কিছুই বুঝি না। ব্যাপক বিরক্তিকর। নর্থ আমেরিকায় স্বাভাবিকভাবেই এই সমস্যায় পড়তে হয় না। বেশ ঘোরাঘুরি করেছি ওখানে। টরোন্টো জু, কাসা লোমা, সিএন টাওয়ার আর নায়াগ্রা ফলস। অফ-সীজনে যাওয়ায় নায়াগ্রা ফলসের পুরো আভিজাত্য হয়ত দেখিনি তবে এই আমার কাছে ঢের। অনেকদিন মনে থাকবে টরোন্টো আর বন্ধুদের বিশেষ করে আমার আইইউটির রুমমেট সবুজ আর জুনিয়র ফারাবীর আতিথেয়তার কথা।

৬।
ব্যাক টু রিয়েলিটি। পেপার এর ডেডলাইন আছে ২২ তারিখ। কোডিং কেবল শেষ করলাম। Java, SQL আর SPARQL এর Syntax এর চোটে সবকিছুই এখন ঘোলা ঘোলা লাগছে। মেইন প্ল্যাটফর্মে এখনও Integration করা বাকি। তারপর রেজাল্ট কালেকশন। এবং পেপার লেখা ... শেষ লাইনটা অবশ্য ঠিক করে রেখেছি এখনই; Our algorithm outperforms ... এর নামই জ্ঞানার্জন।

৭।
আজকে আমাদের ডাটাবেস গ্রুপের প্রফেসরের চাকরির ২৫ বছর উদযাপিত হল। এই উপলক্ষে তার সব প্রাক্তন আর বর্তমান ছাত্রদের নিয়ে "বিশাল সমাবেশ" আর খানাপিনা ছিল। অনেকেঢ় কর্মজীবনেই তাদের আগের গবেষণার কোন সুস্পষ্ট প্রভাব নেই। এক মহিলা এসেছিলেন। তিনি এখন ৭ একর জায়গায় বাগান বাড়ি করেছেন। সারাদিন বাগান নিয়েই থাকেন। অনেকে চলে গেছেন ম্যানেজেরিয়াল লাইনে। আর খুব কমই আছেন শিক্ষকতায়। জীবনের মজা তো এটাই না? শেষটা কখনও দেখা যায় না।

৮।
গত সামারে বার্লিন বাদে আর কোথাও ঘোরা হয়নি। এখন এদিককার আবহাওয়া খুবই খারাপ। তারপরও মনে হয় ব্রাসেলসে যেতে পারি। আসল কারণ ওয়ার্কশপ আর সাথে কলাটিও বেচে আসি।

বৃহস্পতিবার, ২২ জুলাই, ২০১০

চলিতে চলিতে থেমে যায় - ১

১।
নিজেই অবাক হয়ে গেলাম। শেষ লিখেছিলাম তা প্রায় তিন মাস হতে চলল। সময় কী এতটাই দ্রুত চলে যায়? যায় হয়ত। আমাদের বয়স বেড়ে যায়। না বলা কথাগুলো মনের মাঝে প্যাঁচ খায়। তারপর, সেই কথাটা বলার প্রয়োজনই হয়ত ফুরিয়ে যায় আজীবনের জন্য। প্রয়োজন পুরোটা ফুরানোর আগেই লিখে রাখি বরং কিছু কথা আজকে। জমা থাকুক আগামীর জন্য। স্মৃতি রোমন্থনের জন্য।

২।
এই লেখার উপরের অংশটুকু গতকাল রাতে লেখা। ইদানীং একদমই লিখতে পারি না। কী-বোর্ড চলে না। এখন অফিসে বসে লিখছি। কলিগরা প্রায় সবাই ছুটিতে আর যে ক'জন আছেন, তারা এখন দুপুরের খাবার সারতে ব্যস্ত।

ইউরোপে এই সময়টায় প্রায় সব অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়ই প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। স্টুডেন্টদের তো একেবারে ঘোষণা দিয়েই 'সামার ভ্যাকেশন'। আর বাকীরাও এই সময়টাতেও ছুটি নিয়ে এদিক-সেদিক চলে যায়। আমাদের গ্রুপের সেক্রেটারী ইডা ঘুরে আসলো ইটালী থেকে। আমাদের এক প্রফেসর, মার্টিন সেও গিয়েছিল ছুটি কাটাতে ইটালী। সিস্টেম অ্যাডমিন, ইয়ান তো রীতিমত প্রফেশনাল ট্র্যাকার আর ক্লাইম্বার। এই ছুটিতে গিয়েছিল নেপালে। কোনদিন হয়ত শুনবো ইয়ান এভারেস্ট জয় করে ফেলেছে।

৩।
মুসা ইব্রাহীম। কিছুদিন আগেও এই নামটা আমি জানতাম না। এখন জানি। সমগ্র বাংলাদেশ জানে। তবে তার এই অর্জন এখন বেশ কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই প্রশ্নকারীদের এবং মুসা, উভয় পক্ষের উপরই বিরক্ত। কারণ, আমি সত্য কোনটা বুঝতে পারছি না। তবে আপাতত আমি মুসাকে 'বেনিফিট অব ডাউট' দিয়ে রেখেছি। কারণ হল, যারা প্রশ্ন তুলেছেন মুসার এই অর্জন নিয়ে, তারা কেউই নিজ চোখে দেখে আসেননি যে মুসা ওঠেনি। সত্যটা খুব শীঘ্রি জ্বলজ্বল করে উঠুক, এটাই আমার চাওয়া।

৪।
বিশ্বকাপটা কিন্তু এবার ফুটবলে যাদের নাম প্রায় 'চোকার' হয়ে গিয়েছিল তাদের হাতেই জ্বলজ্বল করছে। ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস ছিল বলেই আমি স্পেনকে সমর্থন করিনি। ব্যাপারটা আসলে ইচ্ছাকৃতও নয়। এত এত কমলার ভীড়ে নিজেও কমলা পড়ে মনের ভিতরে আর লালকে ঠাঁই দিতে পারিনি। ডাচরা এই বিশ্বকাপে কখনই সুন্দর ফুটবল খেলেনি। খেলেছে কার্যকরী ফুটবল। ফাইনালটা জিতে গেলে হয়তবা তখন আমরা তাদের এই কার্যকরী ফুটবলেরই গুণগান গাইতাম। কারণ? শুধুমাত্র বিজয়ীরাই ইতিহাস লিখতে পারে। পরাজিতদের বীরত্বগাঁথা কেউ মনে রাখে না দু'দিন পরে।

স্পেনকে অভিনন্দন। তাদের সুন্দর ফুটবল ভবিষ্যতে আরো ফলবান (বেশি বেশি গোল) হোক এটাই প্রত্যাশা। সবচেয়ে কম গোল করে বিশ্বকাপ জয়টা স্পেনের সুন্দর ফুটবলের সাথে ঠিক যায় না বলেই আমার এই চাওয়া।

৫।
বাংলাদেশ সব টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোকে হারানোর পরে যে নিজেরাই যে সবার কাছে হেরে উল্টো রেকর্ডটাও করতে চাইবে বুঝিনি। তাহলে হয়ত বলতাম, ইংল্যান্ডকে ছেড়ে দে; আয়ারল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডসের সাথে জিতে আয়।

বাংলাদেশের নেদারল্যান্ডসের সাথে খেলার দিন লাঞ্চ আওয়ারে ডাচ কলিগদের একথা বলছিলাম। এটাও যোগ করলাম বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলে এবং আয়োজকের মর্যাদাও পাচ্ছে খুব শীঘ্রি। আমার ডাচ কলিগরা অবশ্য পরে কেউ আর খেলার খবর জানতে চায়নি বলে বাঁচোয়া।

৬।
আমি এই সামারে ছোট ছোট ট্রিপের প্ল্যান করেছি। সেই মোতাবেক ঘুরে এলাম বার্লিন থেকে। জার্মানী সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল এখানে হয়ত দেখার মত তেমন কিছু নেই (অবশ্যই ঐতিহাসিক স্থান বাদে)। বার্লিন দেখে আমার ধারণা বেশ ভুল প্রামাণিত হয়েছে।

এক সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম 'পোটসড্যামার প্লাটজ' এ। বার্লিনের নতুন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ওখানে গিয়ে দেখলাম রঙের মেলা আর হাজার হাজার লোক। ওখানেই আছে সনির ইউরোপিয়ান হেড কোয়ার্টার। আছে আইম্যাক্স আর অসংখ্য সুসজ্জিত রেস্টুরেন্ট। একটা ছবি দিয়ে যাই এবেলা। পরে আরও আসবে।
পোটসড্যামার প্লাটজ


বার্লিনে গেলে অবশ্যই রাত নামলে পরে ঘুরে আসবেন 'পোটসড্যামার প্লাটজ'। ওখান থেকে কাছেই রাইসট্যাগ (জার্মান পার্লামেন্ট) আর ব্রান্ডেনবুর্গ গেট। ওদুটোও রাতেই স্বমহিমায় ধরা দেবে আপনার কাছে। তবে রাত দশটার পরে গেলে আমাদের মত দূর থেকেই রাইসট্যাগের ছবি তুলতে হবে।
রাইসট্যাগ (জার্মান পার্লামেন্ট)

ব্রান্ডেনবুর্গ গেট

৭।
লিখতে লিখতে দেখি অনেক লিখে ফেলেছি। এবার থামতে হয়। কোডিং এর কাজ বাকী। কোডিং করে ইদানীং মজা পাচ্ছি। এক মাস্টার্স স্টুডেন্ট এর কোড করা একটা Data Stream Processing Engine আমাকে আরো একটু আপ্রগ্রেড করতে হচ্ছে আমার নিজের রিসার্চের Prototype এর জন্যই। প্রথম দিকে বেশ বেগ পেয়েছিলাম কোড Re-engineering করতে যেয়ে। তবে এখন বেশ আয়ত্ত্বে চলে এসেছে।

পিএইচডি পাওয়ার পূর্বশর্ত পাবলিকেশনস। রানের খাতা খুলতে পেরেছি এই ভেবে বেশ ভালোই লাগছে।

মাস দুয়েক পরে কী তবে দেখা হবে আপনার সাথে? সিঙ্গাপুরে?